কাটাঘুড়ি ২৫.০২.২০২১

কাটাঘুড়ি ২৫.০২.২০২১

জন্ম আমার আসলেই ধন্য হলো

 

ছবির গান,সারা বাংলাদেশ এর অজস্র মঞ্চে গাইবার আমন্ত্রণ এবং সফল পদচারনা, বিদেশ ট্যুর সবই চলছিলো। বড় বড় দৈনিক পত্রিকায় বড় বড় ইন্টারভিউ তাও চলছিলো। ভোরের কাগজ থেকে সম্পাদকসহ কিছু সাংবাদিক বের হয়ে গিয়ে প্রথম আলো করলেন চোখের সামনে। প্রথম আলোর সাংবাদিক, সম্পাদক সবাই আমাকে খুবই স্নেহ করতেন। সম্পাদক মতিউর রহমান ভাই খুবই স্নেহ করতেন আমাকে। উনিই আমাকে মাঝেমধ্যে এক একটা বিষয় দিয়ে বলতেন এই সম্পর্কে লিখো তো বোন।আমি এই প্রথম জানলাম আমি লিখতে পারি, আমি প্রতিবাদ করতে পারি,আমার নিজের বলার অনেক কিছু আছে,আমার নিজস্ব দর্শন আছে।মতি ভাই আমাকে অনেক বড় বড় লেখক কথাসাহিত্যিক চিন্তাবিদদের সঙ্গে এক একটি সাব্জেক্ট এ লিখতে বলতেন! আমি কিন্তু একদম ভয় পাইনি।আমি আমার ভাবনাকে বুঝে নিয়ে বলার মতো করে লিখতাম।নিশ্চয়ই কিছু একটা দাঁড়াতো না হলে তো আর লেখার ধারাবাহিকতা থাকতো না।যাইহোক সেই প্রথম আলো মেরিল টয়লেট্রিজ কোম্পানির সঙ্গে মিলে পাঠক জরিপ এর ভিত্তিতে বছরের সেরা কণ্ঠশিল্পী থেকে অভিনয় শিল্পী সহ নানারকম ক্যাটাগরিতে পুরস্কার প্রবর্তন করলো। এই পুরস্কারের বিশেষত্ব হলো তারা প্রতি বৃহস্পতিবার কুপন ছাড়তো, পাঠক সেই কুপন পছন্দের বিষয়ে টিক মার্ক দিয়ে কুপনটি পোস্ট করতো। সোজা কথা পাঠক জরিপ পুরস্কার।

পুরস্কার প্রবর্তন এর প্রথমবারই আমি ও শ্রদ্ধেয় কিংবদন্তি শিল্পী কিশোর’দা শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পীর পুরস্কার পেলাম। সে এক অভাবনীয় অনুভূতি। তখন মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার এখনকার মতো এতো সাজানো গোছানো জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে হয়নি।তারপর ও শেরাটনের উইন্টার গার্ডেনে  অনুষ্ঠিত  এ আয়োজনে বাংলাদেশের সব দামী দামী সম্মানিত গুনিজনরা আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে এসেছিলেন। আমাদের কোন রিহার্সাল হয়নি।অনুষ্ঠান স্থলে যাওয়ার পর বলা হলো শাকিলা আপা,সামিনা আপা,আমি মিলে যেন একটা গান একসঙ্গে মঞ্চে গাই। উপস্থিত ভাবে তেমন কোন গান তিনজনের মাথায় এলো না।তারপর তিনজন মিলে যে জন প্রেমের ভাব জানেনা গানটি ঠিক করলাম। আমার পুরস্কার পাওয়া নিয়ে আশা ভরসা কল্পনা ভয় আশংকা কিছুই ছিলো না।আমি খুব সাধারণ একটা সিল্ক কাতান শাড়ি পরে হালকা পাউডার লিপস্টিক মেখে উপস্থিত হয়েছিলাম।খুব মজা করেই আমরা তিনজন গাইলাম। গেয়ে নামলাম। একটু পরে মঞ্চে আমাদের গণসংগীত এর বরেণ্য ব্যাক্তিত্ব সুরকার সংগীত পরিচালক গায়ক আব্দুল লতিফ ভাই ডাকলেন এই বলে যে সেরা মহিলা কণ্ঠশিল্পী যে সে কি একটু চেপে চেপে আছে! সবাই টের পেলো কার নাম উচ্চারিত হবে, আমি গাধা গা এলিয়ে সিটে স্বামীর পাশে বসেই আছি।পাশে থেকে শাকিলা আপা গুঁতা দিয়ে বললেন কনক,তোকে মঞ্চে ডাকে, যা গাধা! আমি সম্বিত ফিরে পেয়ে হুড়মুড় করে উঠলাম।

পায়ের নীচে শাড়ি আটকে গেলো।আমি তা ছাড়িয়ে নিয়ে জীবনসঙ্গী কে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলাম।মঞ্চ থেকে লতিফ ভাই ঠাট্টাচ্ছলে বলছিলেন বলেছিলাম না কনক চাঁপা খালি চেপে চেপে থাকে! হল জুড়ে হাসির ঝড় উঠলো। আমি ভাবছিলাম প্রথম আলো কেন শুধু একটি কার্ডে দুজনের নাম লিখলো! এখন আব্বা উপস্থিত থাকলে আমার পুরো আনন্দ পরিপূর্ণ হতো! ১৯৭৬ সালে প্রথম যখন রেডিও বাংলাদেশ এ শিশুর চেয়েও শিশু হিসেবে গান গাইতে গিয়েছি তখন নিতান্তই খালি গলায় ” আপামনি আমি একটা গান গাইবো” বলে শুরু করেছিলাম তখন অনেক বড় বড় সুরকার সংগীত পরিচালক দের মাঝে এই লতিফ ভাইই আমাকে আবিস্কার করেন।নিজের উদ্যোগে আমার আব্বার সঙ্গে কথা বলেন। বিশেষ যত্নে আমাকে দিয়ে সুন্দর সুন্দর গান রেকর্ড করান অনেক বড় বড় সুরকারদের দিয়ে। শেষমেশ উনি গীতিকবি এবং কলকাকলি অনুষ্ঠানের প্রযোজক জনাব ফজলে খোদা সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্তে আসেন যে এই মেয়েটাকে প্রপার কোন সঙ্গীতশিক্ষকের হাতে দিতে হবে।আব্বার সঙ্গে আলাপ করে উনারা দু’জন আলাপ করে আমাকে গান শেখাতে নিয়ে গেলেন বাংলাদেশের প্রথিতযশা কিংবদন্তি জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী জনাব বশীর আহমেদ সাহেবের কাছে।এটাই আসলে আমার জীবনের শুরু! আজ আমি সেই লতিফ ভাইয়ের হাত থেকে পাঠকের জরিপে বছরের শ্রেষ্ঠ শিল্পীর পুরস্কার নিচ্ছি! কোনমতে হোঁচট খেতে খেতে মঞ্চে গেলাম। লজ্জায় ঘেমে যাচ্ছিলাম। মনে হলো মাথার উপর দুই মহাশিল্পী সাবিনা’পা রুনা’পা,আর সেখানে আমি পাঠক জরিপ! শাড়ি পায়ে পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছিলো, খোলা চুল সামনে এসে জড়াচ্ছিলো, মঞ্চে পৌঁছাতে মনে হয় রাস্তা ফুরাচ্ছিলোই না।সে অনুভূতি আমি আজোও ভুলিনি।

ইতোমধ্যেই জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি, বাংলাদেশের গানের জন্য সর্বোচ্চ সম্মানজনক পুরস্কার,তাতে কিছু গুনীজন গভীর ভাবে বিচার করে পুরস্কার বিবেচনা করেন কিন্তু এই পুরস্কারটা সাধারণ পাঠকদের বিচার, এই পুরস্কারকে আমার কাছে জাতীয় পুরস্কার এর চেয়েও বড় সম্মান, আনন্দ,ও মূল্যায়নের বলে বিবেচিত হতে লাগলো। দর্শক আসনে লতিফ ভাই ডাকলেন।আমি পাশে গিয়ে বসলাম। উনি উনার হাত আমার মাথায় দিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন, আমি অঝোরে কেঁদে ফেললাম। আমার আবেগ উনাকে ছুঁয়ে গেলো নাকি উনার আবেগ আমাকে ছুঁয়ে গেলো জানিনা।আমি আব্বাকে ভাবছিলাম, উনি কাকতালীয় ভাবে জিজ্ঞেস করলেন তোর বাবা কেমন আছে? আমি বাস্পরুদ্ধ কণ্ঠে কোনমতে বললাম আছেন আলহামদুলিল্লাহ। বললেন যা,সিটে গিয়ে বোস।আরও পুরস্কার হবে দোয়া দিলাম! আমি সিটে এসে বসলাম। অনুষ্ঠানের বাকি সময় মানুষের সামনেই আমার জীবনসঙ্গী আমার হাত ধরে বসে রইলেন। অনেক সম্মান, অনেক ভালোবাসা, অনেক আশীর্বাদ, অনেক বিস্মিত স্নেহময় দৃষ্টি সেদিন উপহার পেলাম। বাড়ি আসতে আসতে বারবারই মনে হচ্ছিলো ‘জন্ম আমার আসলেই ধন্য হলো।’

কার্টেসি: প্রাণের বাংলা